আচ্ছা, ভাবুন তো, আপনি একটা সাইকেলে চড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই রাস্তায় ঘুরছেন, অথবা একটা ঘড়ির কাঁটা অবিরাম একই পথে চলছে। কেমন লাগবে? একটু অন্যরকম, তাই না? আজ আমরা এরকমই একটা মজার জিনিস নিয়ে কথা বলব – বৃত্ত।
বৃত্ত! নামটা শুনলেই কেমন একটা গোলগাল ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তাই না? কিন্তু এই গোল জিনিসটার ভেতরে যে কত কথা লুকানো আছে, সেটা কি জানেন? চলুন, আজ আমরা বৃত্তের অন্দরমহলে ডুব দেই, আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি এই জিনিসটা আসলে কী, এর বৈশিষ্ট্যগুলোই বা কেমন, আর কেনই বা এটা গণিতের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ।
বৃত্ত কী? (What is a Circle?)
গণিতের ভাষায়, বৃত্ত হলো একটি সমতলে অবস্থিত সেই সকল বিন্দুর集合 (set), যারা একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে সবসময় সমান দূরত্বে থাকে। এই নির্দিষ্ট বিন্দুটিকে বলা হয় বৃত্তের কেন্দ্র (center), আর কেন্দ্র থেকে পরিধির (circumference) দূরত্বকে বলা হয় ব্যাসার্ধ (radius)।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, একটা নির্দিষ্ট জায়গায় একটা পেন্সিল বসিয়ে, চারদিকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে আনলে যে গোল আকারের চিত্রটা পাওয়া যায়, সেটাই হলো বৃত্ত। তবে সবসময় তো আর দড়ি দিয়ে ঘোরানো সম্ভব না, তাই না? তাই কম্পাস ব্যবহার করে নিখুঁত বৃত্ত আঁকা যায়।
বৃত্তের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ (Important Parts of a Circle)
বৃত্তকে ভালোভাবে বুঝতে হলে, এর কিছু অংশ সম্পর্কে জানতে হবে। নিচে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো:
-
কেন্দ্র (Center): বৃত্তের একেবারে মাঝখানের বিন্দুটি হলো কেন্দ্র। এখান থেকেই বৃত্তের পরিধির প্রতিটি বিন্দুর দূরত্ব সমান।
-
ব্যাসার্ধ (Radius): কেন্দ্র থেকে বৃত্তের পরিধির যেকোনো বিন্দুর দূরত্বকে ব্যাসার্ধ বলে।
-
ব্যাস (Diameter): বৃত্তের কেন্দ্র দিয়ে অতিক্রমকারী এবং পরিধির দুই প্রান্তকে স্পর্শকারী সরলরেখা হলো ব্যাস। এটি ব্যাসার্ধের দ্বিগুণ (D = 2r)।
-
পরিধি (Circumference): বৃত্তের সম্পূর্ণ সীমারেখা বা দৈর্ঘ্যকে পরিধি বলে।
-
চাপ (Arc): বৃত্তের পরিধির যেকোনো অংশকে চাপ বলা হয়।
-
জ্যা (Chord): বৃত্তের পরিধির যেকোনো দুটি বিন্দুকে সংযোগকারী সরলরেখা হলো জ্যা।
-
বৃত্তাংশ (Segment): জ্যা এবং চাপের মধ্যে আবদ্ধ অঞ্চলকে বৃত্তাংশ বলে।
-
ক্ষেত্রাংশ (Sector): দুইটি ব্যাসার্ধ এবং একটি চাপ দ্বারা আবদ্ধ অঞ্চলকে ক্ষেত্রাংশ বলে।
অংশ | সংজ্ঞা | বৈশিষ্ট্য |
---|---|---|
কেন্দ্র | বৃত্তের মাঝখানের বিন্দু | এখান থেকে পরিধির দূরত্ব সমান |
ব্যাসার্ধ | কেন্দ্র থেকে পরিধির দূরত্ব | বৃত্তের আকার নির্ধারণ করে |
ব্যাস | কেন্দ্র দিয়ে পরিধির দুই প্রান্তের সংযোগ | ব্যাসার্ধের দ্বিগুণ |
পরিধি | বৃত্তের সীমারেখা | বৃত্তের দৈর্ঘ্য |
চাপ | পরিধির অংশ | ক্ষেত্রফল নির্ণয়ে কাজে লাগে |
জ্যা | পরিধির দুই বিন্দুর সংযোগ | বৃত্তাংশ তৈরি করে |
বৃত্তাংশ | জ্যা ও চাপের আবদ্ধ অঞ্চল | ক্ষেত্রফল নির্ণয়ে কাজে লাগে |
ক্ষেত্রাংশ | দুইটি ব্যাসার্ধ ও চাপের আবদ্ধ অঞ্চল | ক্ষেত্রফল নির্ণয়ে কাজে লাগে |
বৃত্তের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of a Circle)
বৃত্তের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একে অন্যান্য জ্যামিতিক আকার থেকে আলাদা করে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো:
-
প্রতিসাম্য (Symmetry): বৃত্ত একটি প্রতিসম আকার। এর কেন্দ্র দিয়ে যেকোনো সরলরেখা টানলে, সেটি বৃত্তকে সমান দুই ভাগে ভাগ করবে।
-
কোনো প্রান্ত নেই (No Edges): বৃত্তের কোনো প্রান্ত বা কোণ নেই। এটি একটি মসৃণ বক্ররেখা।
-
সর্বোচ্চ ক্ষেত্রফল (Maximum Area): একই পরিসীমা বিশিষ্ট অন্য যেকোনো আকারের তুলনায় বৃত্তের ক্ষেত্রফল সবচেয়ে বেশি।
-
ধ্রুবক অনুপাত (Constant Ratio): যেকোনো বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত সবসময় একটি ধ্রুব সংখ্যা, যাকে পাই (π) দিয়ে প্রকাশ করা হয়। π এর মান প্রায় ৩.১৪১৫৯।
-
অসীম সংখ্যক প্রতিসাম্য রেখা (Infinite Lines of Symmetry): একটি বৃত্তের কেন্দ্র দিয়ে অসীম সংখ্যক সরলরেখা আঁকা যায়, যা প্রতিসাম্য রেখা হিসেবে কাজ করে।
বৃত্তের পরিধি ও ক্ষেত্রফল (Circumference and Area of a Circle)
বৃত্তের পরিধি এবং ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট সূত্র রয়েছে। এগুলো ব্যবহার করে সহজেই বৃত্তের আকার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
পরিধি (Circumference)
বৃত্তের পরিধি নির্ণয়ের সূত্র হলো:
C = 2πr
এখানে,
C
হলো পরিধিπ
(পাই) হলো একটি ধ্রুবক, যার মান প্রায় ৩.১৪১৫৯r
হলো ব্যাসার্ধ
ক্ষেত্রফল (Area)
বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের সূত্র হলো:
A = πr²
এখানে,
A
হলো ক্ষেত্রফলπ
(পাই) হলো একটি ধ্রুবক, যার মান প্রায় ৩.১৪১৫৯r
হলো ব্যাসার্ধ
বৃত্তের ব্যবহার (Uses of Circle)
বৃত্ত আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানাভাবে জড়িয়ে আছে। এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার নিচে উল্লেখ করা হলো:
-
চাকা (Wheel): বৃত্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো চাকা তৈরি করা। চাকা ব্যবহার করে সহজেই ভারী জিনিস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়।
-
ঘড়ি (Clock): ঘড়ির কাঁটা বৃত্তাকার পথে ঘোরে এবং সময় নির্দেশ করে।
-
পাইপ (Pipe): পানি বা গ্যাস পরিবহনের জন্য পাইপ তৈরি করতে বৃত্তাকার আকার ব্যবহার করা হয়।
-
যন্ত্রপাতি (Machines): বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ঘূর্ণায়মান অংশগুলো বৃত্তাকার হয়ে থাকে।
-
স্থাপত্য (Architecture): অনেক স্থাপত্যের নকশায় বৃত্ত ব্যবহার করা হয়, যা দেখতে সুন্দর এবং মজবুত হয়।
এছাড়াও, বৃত্তাকার নকশা বিভিন্ন অলঙ্কার, লোগো এবং শিল্পকর্মে ব্যবহৃত হয়।
বৃত্তের প্রকারভেদ (Types of Circles)
গণিত এবং জ্যামিতিতে, বৃত্তকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে কয়েকটি প্রধান প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো:
-
সাধারণ বৃত্ত (Standard Circle): এটি হলো সেই বৃত্ত, যা আমরা সাধারণত দেখে থাকি এবং যার একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র ও ব্যাসার্ধ থাকে। এই বৃত্তের কেন্দ্র সাধারণত স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় (x, y) দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।
-
সমকেন্দ্রিক বৃত্ত (Concentric Circle, একই কেন্দ্র বিশিষ্ট বৃত্ত): একাধিক বৃত্ত যদি একই কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়, তবে সেই বৃত্তগুলোকে সমকেন্দ্রিক বৃত্ত বলা হয়। এক্ষেত্রে বৃত্তগুলোর ব্যাসার্ধ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কেন্দ্র একই থাকে। যেমন: পাথরের মধ্যে ঢিল ছুড়লে যে ঢেউগুলো ওঠে, সেগুলি সমকেন্দ্রিক বৃত্তের মতো দেখতে হয়।
-
স্পর্শক বৃত্ত (Tangent Circle): যদি দুটি বৃত্ত পরস্পরকে একটি বিন্দুতে স্পর্শ করে, তবে সেই বৃত্তগুলোকে স্পর্শক বৃত্ত বলা হয়। স্পর্শক বৃত্ত অভ্যন্তরীণভাবে বা বাহ্যিকভাবে স্পর্শ করতে পারে।
-
ছেদক বৃত্ত (Intersecting Circle): যখন দুটি বৃত্ত পরস্পরকে দুইটি বিন্দুতে ছেদ করে, তখন সেই বৃত্তগুলোকে ছেদক বৃত্ত বলা হয়।
-
একক বৃত্ত (Unit Circle): একক বৃত্ত হলো সেই বৃত্ত, যার ব্যাসার্ধ ১ একক। এই বৃত্ত ত্রিকোণমিতি এবং জটিল সংখ্যা তত্ত্বের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত হয়। স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় এর কেন্দ্র সাধারণত মূল বিন্দুতে (0, 0) অবস্থিত থাকে।
প্রকারভেদ | সংজ্ঞা | বৈশিষ্ট্য | ব্যবহার |
---|---|---|---|
সাধারণ বৃত্ত | নির্দিষ্ট কেন্দ্র ও ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট বৃত্ত | কেন্দ্র ও ব্যাসার্ধ থাকে | জ্যামিতিক অঙ্কন ও সমস্যা সমাধান |
সমকেন্দ্রিক বৃত্ত | একই কেন্দ্র বিশিষ্ট একাধিক বৃত্ত | কেন্দ্র একই, ব্যাসার্ধ ভিন্ন | নকশা তৈরি ও স্থাপত্যবিদ্যা |
স্পর্শক বৃত্ত | পরস্পরকে একটি বিন্দুতে স্পর্শ করে | একটিমাত্র সাধারণ বিন্দু থাকে | জ্যামিতিক সমস্যা সমাধান |
ছেদক বৃত্ত | পরস্পরকে দুইটি বিন্দুতে ছেদ করে | দুইটি সাধারণ বিন্দু থাকে | জ্যামিতিক অঙ্কন ও সমস্যা সমাধান |
একক বৃত্ত | ব্যাসার্ধ ১ একক | ত্রিকোণমিতিতে ব্যবহার করা হয় | ত্রিকোণমিতি ও জটিল সংখ্যা তত্ত্ব |
বৃত্ত এবং ত্রিকোণমিতি (Circle and Trigonometry)
ত্রিকোণমিতিতে বৃত্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে একক বৃত্তের ধারণাটি ত্রিকোণমিতিক ফাংশনগুলোর সংজ্ঞা এবং বৈশিষ্ট্য বুঝতে সহায়ক।
একক বৃত্ত (Unit Circle)
একক বৃত্ত হলো একটি বৃত্ত যার ব্যাসার্ধ ১ একক এবং কেন্দ্র মূল বিন্দুতে (0, 0) অবস্থিত। এই বৃত্তের মাধ্যমে সাইন (sine), কোসাইন (cosine), ট্যানজেন্ট (tangent) ইত্যাদি ত্রিকোণমিতিক ফাংশনগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
- সাইন (Sine): একক বৃত্তের পরিধির উপর অবস্থিত কোনো বিন্দু (x, y) এর y-স্থানাঙ্ককে ঐ কোণের সাইন বলা হয়। অর্থাৎ, sin(θ) = y।
- কোসাইন (Cosine): একক বৃত্তের পরিধির উপর অবস্থিত কোনো বিন্দু (x, y) এর x-স্থানাঙ্ককে ঐ কোণের কোসাইন বলা হয়। অর্থাৎ, cos(θ) = x।
- ট্যানজেন্ট (Tangent): সাইন এবং কোসাইনের অনুপাতকে ট্যানজেন্ট বলা হয়। অর্থাৎ, tan(θ) = y/x = sin(θ)/cos(θ)।
ত্রিকোণমিতিক অভেদাবলী (Trigonometric Identities)
বৃত্তের ধারণা ব্যবহার করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ত্রিকোণমিতিক অভেদাবলী প্রমাণ করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত অভেদাবলী হলো:
- sin²(θ) + cos²(θ) = 1
- tan(θ) = sin(θ) / cos(θ)
- cot(θ) = cos(θ) / sin(θ)
এই অভেদাবলীগুলো ত্রিকোণমিতিক সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত उपयोगी।
কোণের পরিমাপ (Angle Measurement)
বৃত্তের মাধ্যমে কোণের পরিমাপ রেডিয়ান (radian) এককে সহজে বোঝা যায়। রেডিয়ান হলো বৃত্তের ব্যাসার্ধের সমান দৈর্ঘ্যের চাপ দ্বারা কেন্দ্রে উৎপন্ন কোণ। একটি সম্পূর্ণ বৃত্তের কেন্দ্রে 2π রেডিয়ান কোণ উৎপন্ন হয়।
বৃত্ত এবং ত্রিকোণমিতির মধ্যে এই সম্পর্ক গণিত এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যবহৃত হয়, যেমন ক্যালকুলাস, পদার্থবিজ্ঞান, এবং প্রকৌশল।
বৃত্ত নিয়ে কিছু মজার তথ্য (Fun Facts About Circles)
বৃত্ত নিয়ে কিছু মজার তথ্য জেনে নেওয়া যাক, যা হয়তো আগে আপনার জানা ছিল না:
-
প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদ আর্কিমিডিস বৃত্তের পরিধি নির্ণয়ের জন্য পাই (π) এর একটি approximation বের করেছিলেন।
-
বৃত্ত হলো একমাত্র আকার যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষেত্রফল আবদ্ধ করা যায়, যদি পরিসীমা একই থাকে। Imagine করুন, আপনার কাছে একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের দড়ি আছে। সেই দড়ি দিয়ে আপনি যদি একটি বর্গক্ষেত্র (square), ত্রিভুজ (triangle), অথবা বৃত্ত তৈরি করেন, তাহলে বৃত্তের ক্ষেত্রফল সবচেয়ে বেশি হবে।
-
বৃত্তের ধারণা শুধু গণিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি এবং শিল্পকর্মেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেক জাতির সংস্কৃতিতে বৃত্তকে সম্পূর্ণতা এবং অনন্তের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
-
বৃত্তের পরিধি নির্ণয়ের সূত্র প্রথম আবিষ্কার করেন আর্কিমিডিস।
-
“Squaring the circle” নামে একটা বিখ্যাত গাণিতিক সমস্যা আছে, যেখানে শুধুমাত্র কম্পাস এবং রুলার ব্যবহার করে একটি বৃত্তের সমান ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট বর্গক্ষেত্র তৈরি করতে বলা হয়। যদিও উনিশ শতকে এটা প্রমাণ করা হয়েছে যে এটা সম্ভব নয়, তবুও এটা গণিতবিদদের মধ্যে আজও আলোচনার বিষয়।
বৃত্ত সম্পর্কিত কিছু প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions about Circles)
বৃত্ত নিয়ে অনেকের মনেই কিছু প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে। নিচে তেমনই কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
১. বৃত্ত এবং গোলকের মধ্যে পার্থক্য কী? (What is the difference between a circle and a sphere?)
বৃত্ত হলো একটি দ্বিমাত্রিক (2D) আকার, যা একটি সমতলে (plane) অবস্থিত। এর দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ আছে, কিন্তু কোনো উচ্চতা নেই। অন্যদিকে, গোলক (sphere) হলো একটি ত্রিমাত্রিক (3D) আকার, যা বৃত্তের মতো একই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, কিন্তু এটি ত্রিমাত্রিকভাবে বিস্তৃত। সহজভাবে বললে, একটি কাগজের উপর আঁকা গোল হলো বৃত্ত, আর একটি ফুটবল হলো গোলক।
২. বৃত্তের কেন্দ্র কীভাবে নির্ণয় করা যায়? (How to find the center of a circle?)
বৃত্তের কেন্দ্র নির্ণয় করার কয়েকটি উপায় আছে:
-
যদি বৃত্তের উপর তিনটি বিন্দু জানা থাকে, তাহলে সেই বিন্দুগুলো দিয়ে যায় এমন দুইটি জ্যা আঁকুন। তারপর জ্যাগুলোর লম্ব দ্বিখণ্ডক আঁকুন। এই লম্ব দ্বিখণ্ডক দুইটি যে বিন্দুতে ছেদ করবে, সেটিই হবে বৃত্তের কেন্দ্র।
-
যদি বৃত্তের সমীকরণ জানা থাকে, তাহলে সমীকরণ থেকে সরাসরি কেন্দ্র নির্ণয় করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি বৃত্তের সমীকরণ (x – h)² + (y – k)² = r² হয়, তাহলে বৃত্তের কেন্দ্র হবে (h, k)।
৩. বৃত্তের ব্যাস এবং পরিধির মধ্যে সম্পর্ক কী? (What is the relationship between the diameter and circumference of a circle?)
বৃত্তের ব্যাস (diameter) এবং পরিধির (circumference) মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে। পরিধি হলো ব্যাসের π (পাই) গুণ। অর্থাৎ, C = πd, যেখানে C হলো পরিধি এবং d হলো ব্যাস।
৪. বৃত্তের ক্ষেত্রফল এবং পরিধি কীভাবে গণনা করা হয়? (How to calculate the area and circumference of a circle?)
বৃত্তের ক্ষেত্রফল (area) এবং পরিধি (circumference) গণনা করার জন্য নিম্নলিখিত সূত্রগুলি ব্যবহার করা হয়:
- ক্ষেত্রফল (Area): A = πr², যেখানে r হলো ব্যাসার্ধ।
- পরিধি (Circumference): C = 2πr, যেখানে r হলো ব্যাসার্ধ।
৫. বৃত্তের জ্যা (chord) কাকে বলে? (What is a chord of a circle?)
বৃত্তের জ্যা (chord) হলো বৃত্তের পরিধির উপর অবস্থিত যেকোনো দুইটি বিন্দুকে সংযোগকারী সরলরেখা। জ্যা বৃত্তের কেন্দ্র দিয়ে যেতেও পারে, আবার নাও যেতে পারে। যদি জ্যা বৃত্তের কেন্দ্র দিয়ে যায়, তবে সেটি বৃত্তের ব্যাস (diameter) হিসেবে পরিচিত হয়, যা বৃত্তের বৃহত্তম জ্যা।
৬. বৃত্তের স্পর্শক (tangent) কাকে বলে? (What is a tangent of a circle?)
বৃত্তের স্পর্শক (tangent) হলো একটি সরলরেখা, যা বৃত্তের পরিধিকে কেবলমাত্র একটি বিন্দুতে স্পর্শ করে। স্পর্শক বৃত্তের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে না। স্পর্শবিন্দুতে স্পর্শক এবং ব্যাসার্ধ পরস্পর লম্বভাবে (perpendicularly) থাকে।
৭. π (পাই) কি? এর মান কত? (What is π (pi)? What is its value?)
π (পাই) হলো একটি ধ্রুব সংখ্যা (constant), যা বৃত্তের পরিধি (circumference) এবং ব্যাসের (diameter) অনুপাতকে প্রকাশ করে। π একটি অমূলদ সংখ্যা (irrational number), অর্থাৎ এর মান দশমিকের পরে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত এবং কোনো পুনরাবৃত্তি হয় না। পাই এর আসন্ন মান হলো ৩.১৪১৫৯ (3.14159)।
৮. বৃত্তকলা (sector) এবং বৃত্তাংশ (segment) এর মধ্যে পার্থক্য কি?
বৃত্তকলা (sector) হলো বৃত্তের দুটি ব্যাসার্ধ এবং একটি চাপ দ্বারা আবদ্ধ অঞ্চল। দেখতে অনেকটা পিৎজার স্লাইসের মতো। অন্যদিকে, বৃত্তাংশ (segment) হলো বৃত্তের একটি জ্যা এবং সেই জ্যা দ্বারা গঠিত চাপ দ্বারা আবদ্ধ অঞ্চল।
আশা করি, এই প্রশ্নগুলো বৃত্ত সম্পর্কে আপনার অনেক দ্বিধা দূর করবে। যদি আরও কিছু জানার থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাসা করতে পারেন!
পরিশেষে, বৃত্ত শুধু একটা জ্যামিতিক আকার নয়, এটা আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। যেমন বৃত্তের শুরু এবং শেষ বোঝা যায় না, তেমনই জীবনের অনেক কিছুই অসীম। তাই বৃত্তকে জানুন, বুঝুন এবং এর সৌন্দর্য উপভোগ করুন। গণিতের এই মজার জগৎ আপনাকে সবসময় নতুন কিছু শেখাবে।
যদি এই লেখাটি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন এবং নিচে কমেন্ট করে জানান আপনি আর কী জানতে চান। আপনার আগ্রহই আমাদের অনুপ্রেরণা! আর হ্যাঁ, বৃত্ত নিয়ে আপনার কোনো মজার অভিজ্ঞতা থাকলে সেটাও জানাতে পারেন। ভালো থাকুন, আর গণিতের সঙ্গে জুড়ে থাকুন!