পৃথিবীটা কি শুধু লাটিমের মতো ঘুরছে, নাকি এর বাইরেও কিছু করছে? মনে আছে, ছোটবেলায় দোলনায় চড়তে কেমন লাগতো? একদিকে যাওয়া, আবার ফিরে আসা – অনেকটা সেরকমই! আমাদের এই পৃথিবীটাও সূর্যের চারিদিকে অবিরাম ঘুরে চলেছে। এই ঘোরাঘুরির একটা বিশেষ নাম আছে, আর সেটাই হলো বার্ষিক গতি। ক্লাস সিক্সের ছাত্র-ছাত্রীরা, চলো আজকের ব্লগ পোস্টে আমরা বার্ষিক গতি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই! যেন, একটা নতুন অ্যাডভেঞ্চারে পাড়ি দিলাম আমরা!
বার্ষিক গতি: পৃথিবীর এক বছর
বার্ষিক গতি মানে হলো, সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর একবার ঘুরে আসা। যেমন ধরো, তুমি তোমার স্কুলের মাঠের চারপাশে একবার হেঁটে এলে, তেমনই পৃথিবী সূর্যের চারপাশে একটা চক্কর মারে।
বার্ষিক গতির সংজ্ঞা
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর ঘূর্ণনকে বার্ষিক গতি বলে। এই পথটা কিন্তু গোল নয়, একটু ডিমের মতো – উপবৃত্তাকার।
বার্ষিক গতি কত দিনে হয়?
পৃথিবীর সূর্যের চারিদিকে একবার ঘুরতে সময় লাগে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। এই সময়টাকেই আমরা এক বছর বলি। তাহলে বুঝতেই পারছো, বছরটা কিন্তু একেবারে নিখুঁত ৩৬৫ দিনের হয় না, কিছুটা বেশি থাকে।
অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার (Leap Year) কী?
ওই যে বছরে ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড বেশি ধরা হয়, সেই বাড়তি সময়টা প্রতি বছর যোগ হতে থাকে। চার বছর পর এই বাড়তি সময়টা প্রায় ১ দিনের সমান হয়ে যায়। সেই জন্য প্রতি চার বছর পর ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন যোগ করা হয়, এবং ঐ বছরটিকে ৩৬৬ দিনে গণনা করা হয়। এই বছরকেই অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার বলা হয়। লিপ ইয়ারে ফেব্রুয়ারি মাস হয় ২৯ দিনে।
বার্ষিক গতির ফলাফল: ঋতু পরিবর্তন
আচ্ছা, তোমরা কি কখনো ভেবে দেখেছো কেন শীতকালে ঠান্ডা লাগে আর গরমকালে সূর্যের তেজ এত বেশি থাকে? এর কারণ কিন্তু পৃথিবীর এই বার্ষিক গতি!
সূর্যের আপাত গতি
পৃথিবী যখন সূর্যের চারপাশে ঘোরে, তখন সূর্যকে দেখে মনে হয় যেন সেও আকাশের মধ্যে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছে। আসলে সূর্য স্থির থাকে, কিন্তু পৃথিবীর গতির কারণে আমাদের এমন মনে হয়। একে সূর্যের আপাত গতি বলে। এই আপাত গতির কারণেই বছরে বিভিন্ন সময়ে সূর্যকে বিভিন্ন উচ্চতায় দেখা যায়।
উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ণ
- উত্তরায়ণ: ২২শে ডিসেম্বর তারিখে সূর্য মকরক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয় এবং এরপর থেকে ধীরে ধীরে উত্তর দিকে সরতে থাকে। এই সময়কালকে উত্তরায়ণ বলে। এই সময় উত্তর গোলার্ধে দিন বড় হতে থাকে এবং রাত ছোট হতে থাকে।
- দক্ষিণায়ণ: ২১শে জুন তারিখে সূর্য কর্কটক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয় এবং এরপর থেকে ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে সরতে থাকে। এই সময়কালকে দক্ষিণায়ণ বলে। এই সময় উত্তর গোলার্ধে দিন ছোট হতে থাকে এবং রাত বড় হতে থাকে।
ঋতু পরিবর্তনের কারণ
পৃথিবীর অক্ষ তার কক্ষপথের সঙ্গে ২৩.৫° কোণে হেলে থাকার কারণে, সূর্যের চারপাশে ঘোরার সময় পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সময়ে সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে।
- গ্রীষ্মকাল: যখন উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে, তখন সেই অংশে গ্রীষ্মকাল হয়।
- শীতকাল: যখন উত্তর গোলার্ধ সূর্য থেকে দূরে সরে যায়, তখন সেই অংশে শীতকাল হয়।
- বসন্তকাল ও শরৎকাল: এই সময় উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝোঁকাও থাকে না আবার সূর্য থেকে বেশি দূরেও সরে যায় না।
ঋতু | সময়কাল | বৈশিষ্ট্য |
---|---|---|
গ্রীষ্মকাল | মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত | উষ্ণ আবহাওয়া, দীর্ঘ দিন, ছোট রাত |
বর্ষাকাল | জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত | প্রচুর বৃষ্টিপাত, আর্দ্র আবহাওয়া |
শরৎকাল | সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত | মনোরম আবহাওয়া, তাপমাত্রা কমতে শুরু করে |
শীতকাল | ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত | শীতল আবহাওয়া, ছোট দিন, দীর্ঘ রাত |
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বার্ষিক গতি সম্পর্কে আরও কিছু মজার তথ্য জেনে রাখা ভালো।
###কক্ষপথ (Orbit)
কক্ষপথ হলো সেই নির্দিষ্ট পথ, যার উপর দিয়ে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে। পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হওয়ার কারণে, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সব সময় সমান থাকে না।
###উপসূর ও অপসূর (Perihelion and Aphelion)
- উপসূর: ৩রা জানুয়ারি তারিখে পৃথিবী সূর্যের সবচেয়ে কাছে আসে। এই অবস্থানকে অনুসূর বলা হয়। এই সময় সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব থাকে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লক্ষ কিলোমিটার।
- অপসূর: ৪ঠা জুলাই তারিখে পৃথিবী সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করে। এই অবস্থানকে অপসূর বলা হয়। এই সময় সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব থাকে প্রায় ১৫ কোটি ২০ লক্ষ কিলোমিটার।
পৃথিবী যখন সূর্যের চারিদিকে ঘোরে, তখন এর গতি সব জায়গায় সমান থাকে না। যখন পৃথিবী সূর্যের কাছে থাকে, তখন তার গতি বেড়ে যায়, আবার যখন দূরে থাকে তখন গতি কমে যায়।
বার্ষিক গতি সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
এখানে কিছু সাধারণ প্রশ্ন এবং তাদের উত্তর দেওয়া হলো, যা বার্ষিক গতি সম্পর্কে আপনার ধারণা আরও স্পষ্ট করতে সাহায্য করবে:
-
প্রশ্ন: বার্ষিক গতির ফলে কী হয়?
- উত্তর: বার্ষিক গতির ফলে প্রধানত ঋতু পরিবর্তন হয়। এছাড়াও দিনের দৈর্ঘ্য এবং রাতের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন ঘটে।
-
প্রশ্ন: পৃথিবীর বার্ষিক গতির দিক কী?
- উত্তর: পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।
-
প্রশ্ন: বার্ষিক গতি ও আহ্নিক গতির মধ্যে পার্থক্য কী?
* **উত্তর:** বার্ষিক গতি হলো সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর ঘোরা, আর আহ্নিক গতি হলো নিজ অক্ষের উপর পৃথিবীর ঘোরা। বার্ষিক গতির কারণে বছর এবং ঋতু পরিবর্তন হয়, অন্যদিকে আহ্নিক গতির কারণে দিন ও রাত হয়।
-
প্রশ্ন: পৃথিবীর কক্ষপথের আকৃতি কেমন?
- উত্তর: পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার।
-
প্রশ্ন: ঋতু পরিবর্তন কেন হয়?
- উত্তর: পৃথিবীর অক্ষ তার কক্ষপথের সঙ্গে ২৩.৫° কোণে হেলে থাকার কারণে এবং সূর্যের চারিদিকে ঘোরার জন্য ঋতু পরিবর্তন হয়।
-
প্রশ্ন: মকরক্রান্তি রেখা কাকে বলে?
* **উত্তর:** মকরক্রান্তি রেখা হলো দক্ষিণ গোলার্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অক্ষরেখা, যা ২৩.৫° দক্ষিণে অবস্থিত।
- প্রশ্ন: কর্কটক্রান্তি রেখা কাকে বলে?
- উত্তর: কর্কটক্রান্তি রেখা হলো উত্তর গোলার্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অক্ষরেখা, যা ২৩.৫° উত্তরে অবস্থিত।
বার্ষিক গতি: একটি আকর্ষণীয় বিষয়
বার্ষিক গতির ধারণাটি হয়তো প্রথমে একটু কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু একবার যদি বুঝতে পারো, দেখবে এটা খুবই মজার একটা বিষয়। এটা আমাদের জানতে সাহায্য করে কেন বছর ঘুরে ঘুরে আসে, কেন আমরা বিভিন্ন ঋতু উপভোগ করি।
তাহলে, বার্ষিক গতি নিয়ে আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করছি। আশা করি, তোমরা সবাই বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছ। যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, তাহলে কমেন্ট সেকশনে জানাতে পারো।
এবার তোমরা নিজেরাও একটু চিন্তা করে দেখো, বার্ষিক গতির প্রভাবে আমাদের জীবনে আর কী কী পরিবর্তন আসে। নতুন কিছু জানতে পারলে আমাদের সাথে শেয়ার করতে ভুলো না!