আচ্ছা, রসায়ন ক্লাসের সেই বিজারণ বিভবের (Reduction Potential) কথা মনে আছে? মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একটা বিষয়, তাই না? কিন্তু ভয় নেই! আজকে আমরা এই বিজারণ বিভব জিনিসটা কী, সেটা একদম সহজ করে বুঝবো। রসায়নের জটিল সমীকরণ আর সংজ্ঞার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে, আমরা দেখবো দৈনন্দিন জীবনে এর ব্যবহার কোথায়। তাহলে চলুন, শুরু করা যাক!
বিজারণ বিভব: রসায়নের এক মজার খেলা
বিজারণ বিভব (Reduction Potential) হলো কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা species-এর অন্য কোনো পদার্থকে জারিত (oxidize) করার ক্ষমতা অথবা ইলেকট্রন গ্রহণের (electron acceptance) প্রবণতা। শুনতে কঠিন লাগছে? সহজ করে ভাবুন। ধরুন, দুটো দলের মধ্যে একটি “ইলেকট্রন টানাটানি” খেলা হচ্ছে। যে দলের ইলেকট্রন টানার ক্ষমতা বেশি, তারাই জিতবে, তাই তো? বিজারণ বিভব অনেকটা তেমনই। যার বিজারণ বিভব বেশি, সে অন্য পদার্থ থেকে ইলেকট্রন কেড়ে নিতে পারবে।
বিজারণ বিভব কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রশ্ন হলো, এই বিজারণ বিভব জেনে আমাদের কী লাভ? এটা জানা থাকলে আমরা অনেক কিছু prediction করতে পারি!
- কোনো বিক্রিয়া (reaction) স্বতঃস্ফূর্তভাবে (spontaneously) ঘটবে কিনা, সেটা predict করা যায়।
- ব্যাটারির ভোল্টেজ (voltage) হিসাব করা যায়।
- ধাতু (metal) ক্ষয় (corrosion) হবে কিনা, তাও বোঝা যায়।
তাহলে বুঝতেই পারছেন, বিজারণ বিভব রসায়নের জগতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ!
বিজারণ বিভবের পেছনের বিজ্ঞান
এবার একটু গভীরে যাওয়া যাক। বিজারণ বিভব কিভাবে মাপা হয়, আর এর পেছনের বিজ্ঞানটাই বা কী?
তড়িৎদ্বার বিভব (Electrode Potential)
বিজারণ বিভব বোঝার আগে, আমাদের তড়িৎদ্বার বিভব (Electrode Potential) সম্পর্কে জানতে হবে। কোনো ধাতুকে (metal) যখন তার লবণের (salt) দ্রবণে (solution) ডোবানো হয়, তখন ধাতু এবং দ্রবণের মধ্যে একটি বিভব পার্থক্যের (potential difference) সৃষ্টি হয়। এই বিভব পার্থক্যকেই তড়িৎদ্বার বিভব বলে।
প্রমাণ তড়িৎদ্বার বিভব (Standard Electrode Potential)
এই তড়িৎদ্বার বিভব বিভিন্ন শর্তের উপর নির্ভর করে। তাপমাত্রা (temperature), চাপ (pressure) এবং দ্রবণের ঘনমাত্রা (concentration) পরিবর্তন হলে বিভবের মানও বদলে যায়। তাই, একটি নির্দিষ্ট standard condition-এ (২৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ১ atm চাপ এবং ১M ঘনমাত্রা) এই বিভব মাপা হয়। এই நிலைய electrode potential-কে প্রমাণ তড়িৎদ্বার বিভব (Standard Electrode Potential) বলে।
বিজারণ বিভব কিভাবে মাপা হয়?
বিজারণ বিভব সরাসরি মাপা যায় না। Standard Hydrogen Electrode (SHE)-এর সাপেক্ষে অন্য কোনো তড়িৎদ্বারের বিভব নির্ণয় করা হয়। SHE-কে reference হিসেবে ধরা হয়, এবং এর বিভবকে শূন্য (0 ভোল্ট) ধরা হয়।
Standard Hydrogen Electrode (SHE)
SHE হলো একটি প্লাটিনাম (platinum) তড়িৎদ্বার, যার মধ্যে দিয়ে 1 atm চাপে হাইড্রোজেন গ্যাস (hydrogen gas) চালনা করা হয় এবং এটি 1M ঘনমাত্রার অ্যাসিড দ্রবণে (acid solution) ডোবানো থাকে।
বিজারণ বিভব মাপার জন্য, SHE-এর সাথে অন্য তড়িৎদ্বারকে যুক্ত করে একটি তড়িৎরাসায়নিক কোষ (electrochemical cell) তৈরি করা হয়। কোষের ভোল্টেজ মেপে, সেই তড়িৎদ্বারের বিজারণ বিভব নির্ণয় করা হয়।
বিজারণ বিভবকে প্রভাবিত করার কারণগুলো
কিছু জিনিস আছে যা বিজারণ বিভবের মানকে প্রভাবিত করতে পারে। সেগুলো হলো:
- তাপমাত্রা (Temperature): তাপমাত্রা বাড়লে বা কমলে বিজারণ বিভবের মান পরিবর্তিত হয়। সাধারণত, তাপমাত্রা বাড়লে বিজারণ বিভব কমে যায়।
- ঘনমাত্রা (Concentration): দ্রবণের ঘনমাত্রা পরিবর্তন করলে বিজারণ বিভবের মানও পরিবর্তিত হয়। Nernst equation ব্যবহার করে ঘনমাত্রার প্রভাব হিসাব করা যায়।
- চাপ (Pressure): গ্যাসের ক্ষেত্রে চাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চাপ বাড়লে বা কমলে বিজারণ বিভবের মান পরিবর্তিত হতে পারে।
বিজারণ বিভবের প্রয়োগ
বিজারণ বিভবের প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেওয়া হলো:
ব্যাটারি (Battery)
ব্যাটারি কিভাবে কাজ করে, সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এর পেছনে বিজারণ বিভবের ভূমিকা কী, সেটা হয়তো অনেকেরই অজানা। ব্যাটারিতে দুটি তড়িৎদ্বার (anode and cathode) থাকে, যাদের বিজারণ বিভব ভিন্ন। এই বিভব পার্থক্যের কারণেই ব্যাটারিতে ভোল্টেজ (voltage) উৎপন্ন হয়।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি (Lithium-ion Battery)
বর্তমানে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি খুব জনপ্রিয়। এর কারণ হলো এর উচ্চ শক্তি ঘনত্ব (high energy density) এবং দীর্ঘ জীবনকাল (long lifespan)। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির অ্যানোড (anode) এবং ক্যাথোডের (cathode) বিজারণ বিভবের পার্থক্য অনেক বেশি হওয়ার কারণে এটি বেশি ভোল্টেজ দিতে পারে।
ধাতুর ক্ষয় (Corrosion)
লোহা বা অন্য কোনো ধাতু যখন বাতাসের অক্সিজেন (oxygen) এবং জলের (water) সংস্পর্শে আসে, তখন তাতে মরিচা (rust) ধরে। এই প্রক্রিয়াকে ধাতুর ক্ষয় (corrosion) বলে। বিজারণ বিভবের ধারণা ব্যবহার করে ধাতুর ক্ষয় কিভাবে রোধ করা যায়, তা আলোচনা করা হলো:
গ্যালভানাইজেশন (Galvanization)
গ্যালভানাইজেশন হলো একটি পদ্ধতি, যেখানে লোহার উপর দস্তার (zinc) একটি আস্তরণ (coating) দেওয়া হয়। দস্তার বিজারণ বিভব লোহার চেয়ে কম হওয়ায়, এটি আগে জারিত (oxidize) হয় এবং লোহাকে রক্ষা করে।
তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolysis)
তড়িৎ বিশ্লেষণ (electrolysis) হলো একটি প্রক্রিয়া, যেখানে তড়িৎ শক্তি (electrical energy) ব্যবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়া (chemical reaction) ঘটানো হয়। বিজারণ বিভবের ধারণা ব্যবহার করে কোন আয়ন (ion) আগে ক্যাথোডে (cathode) গিয়ে বিজারণ (reduction) হবে, তা predict করা যায়।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিজারণ বিভবের উদাহরণ
এখানে কয়েকটি পরিচিত রাসায়নিক species-এর বিজারণ বিভবের মান দেওয়া হলো:
Species | বিজারণ বিভব (V) |
---|---|
F2(g) + 2e- → 2F-(aq) | +2.87 |
Ag+(aq) + e- → Ag(s) | +0.80 |
Cu2+(aq) + 2e- → Cu(s) | +0.34 |
Zn2+(aq) + 2e- → Zn(s) | -0.76 |
Li+(aq) + e- → Li(s) | -3.05 |
এই table থেকে আমরা বুঝতে পারি, ফ্লোরিনের (fluorine) বিজারণ বিভব সবচেয়ে বেশি, তাই এটি খুব সহজেই অন্য পদার্থকে জারিত করতে পারে। অন্যদিকে, লিথিয়ামের (lithium) বিজারণ বিভব সবচেয়ে কম, তাই এটি খুব সহজে জারিত হয়।
বিজারণ বিভব নিয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
-
বিজারণ বিভব কি সবসময় positive হয়?
না, বিজারণ বিভব positive বা negative দুটোই হতে পারে। যদি কোনো পদার্থের বিজারণ বিভব positive হয়, তার মানে হলো সেই পদার্থ ইলেকট্রন গ্রহণ করতে পছন্দ করে। আর যদি negative হয়, তাহলে সেই পদার্থ ইলেকট্রন ছাড়তে পছন্দ করে।
-
জারন (oxidation) এবং বিজারণ (reduction) কী?
জারন হলো ইলেকট্রন বর্জন (loss of electrons) এবং বিজারণ হলো ইলেকট্রন গ্রহণ (gain of electrons)। জারন এবং বিজারণ সবসময় একসাথে ঘটে।
-
প্রমাণ বিজারণ বিভব (standard reduction potential) বলতে কী বোঝায়?
প্রমাণ বিজারণ বিভব হলো ২৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ১ atm চাপ এবং ১M ঘনমাত্রার দ্রবণে কোনো পদার্থের বিজারণ বিভব।
-
বিজারণ বিভব কিভাবে বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থা (equilibrium) নির্ধারণ করে?
বিজারণ বিভবের মান থেকে কোনো বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। Nernst equation ব্যবহার করে বিক্রিয়ার সাম্যাবস্থা ধ্রুবক (equilibrium constant) নির্ণয় করা যায়। -
বিজারণ বিভব কি পরিবেশের উপর কোনো প্রভাব ফেলে?
হ্যাঁ, বিজারণ বিভব পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলে। যেমন, ধাতুর ক্ষয় (corrosion) একটি পরিবেশগত সমস্যা, যা বিজারণ বিভবের মাধ্যমে বোঝা যায় এবং প্রতিরোধের উপায় বের করা যায়।
বিজারণ বিভব: জীবনের নানা ক্ষেত্রে
তাহলে দেখলেন তো, বিজারণ বিভব শুধু রসায়ন বইয়ের কঠিন একটা সংজ্ঞা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত! ব্যাটারি থেকে শুরু করে ধাতুর ক্ষয়, সবকিছুতেই এর প্রভাব রয়েছে।
বিজারণ বিভব এবং আমাদের ভবিষ্যৎ
বিজ্ঞানীরা এখন বিজারণ বিভবের ধারণা কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন। উন্নত ব্যাটারি (advanced battery), জ্বালানী কোষ (fuel cell) এবং পরিবেশবান্ধব (environment friendly) প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে বিজারণ বিভব একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
আশা করি, বিজারণ বিভব নিয়ে আপনার মনে যে ভয় ছিল, তা কিছুটা হলেও কমেছে। রসায়ন (chemistry) আসলে মজার একটা বিষয়, শুধু একটু ধৈর্য ধরে বোঝার চেষ্টা করতে হয়।
তাহলে আজ এই পর্যন্তই। রসায়নের আরও মজার বিষয় নিয়ে খুব শীঘ্রই আবার দেখা হবে। রসায়ন নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে, নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। টিল দেন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন! আর রসায়ন চর্চা চালিয়ে যান!