রচনাঃ বাংলাদেশের খাদ্য সমস্যা ও তার প্রতিকার

আজকের পোস্টে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা শেয়ার করব “বাংলাদেশের খাদ্য সমস্যা ও তার প্রতিকার“। এই রচনাটি আশা করি তোমাদের পরীক্ষায় কমন আসবে। আমরা এই রচনাটি যত সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করেছি – তোমাদের পড়তে সুবিধা হবে। চলো শুরু করা যাক।

বাংলাদেশের খাদ্য সমস্যা ও তার প্রতিকার

ভূমিকা : সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই দেশ। এক সময় এদেশে ছিল খাদ্যের প্রাচুর্য। খাদ্যসংকট তখনও তার স্বরূপ নিয়ে হাজির হয়নি। কিন্তু আজ এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকারে পূর্ণ। এদেশে শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা। সীমিত সম্পদ দিয়ে এই বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই প্রতিদিন না খেয়ে থাকতে হচ্ছে অনেক মানুষকে। কৃষিজমি হ্রাস, অনুন্নত কৃষিব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা কারণে আমাদের দেশে দেখা দিয়েছে খাদ্যসংকট। বছরের পর বছর ধরে লেগেই আছে এই খাদ্য সংকট। খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রতিবছর খাদ্যশস্য আমদানি করছে, কৃষিখাতে ভর্তুকি দিচ্ছে, খাদ্য মজুদ করছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রবলভাবে বিরাজমান এই খাদ্য সংকট।

খাদ্য সংকট কী : খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে বুঝায় যখন খাদ্যের যথেষ্ট মজুদ থাকবে এবং মানুষ যখন খাদ্য চাইবে তখন তার হাতের কাছে পাবে। World Food Summit Plan of Action Declaration (১৯৯৬)- এর মতে বলা যায় যে, খাদ্য নিরাপত্তা আমরা তখনই বলতে পারি যখন সকল মানুষ তাদের শারীরিক ও অর্থনৈতিক অধিকার সর্বদা | পূর্ণরূপে পাবে এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্য হবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর। আর কেউ যখন তার প্রয়োজনীয় খাদ্য না পায় হয় তখন তাকে বলা হয় খাদ্য সংকট। এই খাদ্য সংকট গোটা বিশ্বে এক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। FAO-এর মতে, ‘বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট কিছু দেশের জন্য গৃহযুদ্ধের জন্ম দিবে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দিবে।’ বিশ্বব্যাপী খাদ্য কর্মসূচির হিসাব মতে, অন্তত ৮৫ কোটি মানুষ ভয়াবহ রকম ক্ষুধার্ত এবং দিন দিন বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

Read More:  রচনাঃ সৎসঙ্গ

বাংলাদেশে খাদ্য পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী ২০১১-২০১২ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন হয়েছিল ৩৪৮.৮৫ লক্ষ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব (ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ পর্যন্ত) অনুযায়ী ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন ৩৭৫.০৮ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি খাতে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২২.৩৬ লক্ষ মেট্রিক টন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে (ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ পর্যন্ত) সার্বিকভাবে দেশে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১.৭৭ লক্ষ মেট্রিক টন। প্রতিবছরই এরকমভাবে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে। খাদ্যশস্যের দেশজ উৎপাদন, আমদানি সত্ত্বেও প্রতিদিনই অনেক মানুষ অভুক্ত থাকছে ।

খাদ্য সংকটের কারণ : বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের চরম শিকার এবং দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধিক দুর্ভিক্ষগ্রস্ত রাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালে এদেশে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তাতে প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটে। এই দুর্ভিক্ষের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যদ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির একত্রীকরণ এবং অপরটি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের PL ৪৮০ খাদ্যনীতির সংকোচন-প্রক্রিয়া যা কিনা বাংলাদেশি নীতিনির্ধারকদের দেশের বাইরে প্রধান খাদ্যশস্য যোগানদাতাদের ওপর নির্ভরশীল না থাকার জন্য বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল । তখন থেকেই তারা খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের নিশ্চয়তাকে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য প্রতিবছর উৎপাদিত হলেও বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় তা স্বল্প। খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং আমদানি করা সত্ত্বেও এদেশে এখনও খাদ্য সংকট বিদ্যমান। বাংলাদেশের খাদ্য সংকটের প্রধান কারণগুলো হলো- দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কৃষি অবস্থা, কৃষিখাতে অপ্রতুল বাজেট, জনসংখ্যা সমস্যা, বিশ্বায়নের প্রভাব, খাদ্যপণ্যে বিনিয়োগের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি পদ্ধতি ইত্যাদি ।

বাংলাদেশের খাদ্য সংকট সমাধানের উপায় : বাংলাদেশে খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এ সমস্যার আশু সমাধান প্রয়োজন। সরকার খাদ্য সংকট সমাধানে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। খাদ্য সংকট সমাধানের সম্ভাব্য উপায়সমূহ নিচে আলোচনা করা হলো :

Read More:  রচনাঃ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

১. উন্নত প্রযুক্তির চাষাবাদ : বাংলাদেশের চলমান খাদ্য সংকট সমাধানে সর্বপ্রথম প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তির চাষাবাদ। কৃষির আধুনিকীকরণ ঘটাতে হবে।

২. কৃষিক্ষেত্রে গবেষণা : খাদ্য সংকট মোকাবিলায় খাদ্যশস্যের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করতে হবে। যেমন— বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল অধিক ফলনশীল এবং কীটপতঙ্গ প্রতিরোধকারী জাত উদ্ভাবন ৷

৩. ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা : আমাদের দেশে জমির যে প্রকৃতি, সেটাকে বিবেচনা করে কোন জমিতে কখন কী ফসল হতে পারে এ গবেষণার প্রয়োজন । এভাবে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মাধ্যমে খাদ্য ঘাটতি কিছুটা হলেও হ্রাস করা সম্ভব।

৪. কৃষি খাতে সহায়তা : খাদ্য ঘাটতি সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন কৃষিখাতে সরকারের সহায়তা। কৃষি খাতে ভর্তুকি, খাদ্যশস্য আমদানি, খাদ্য মজুদ, খাদ্যশস্য সরবরাহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যথাযথ সরকারি সহায়তা পেলে খাদ্য ঘাটতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব ।

৫. খাদ্য বাজেট : খাদ্য সংকট সমাধানে খাদ্য বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। পদ্ধতিগত ও গবেষণা ধর্মী চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে খাদ্য বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।

৬. খাদ্য মজুদ : খাদ্য সংকট মোকাবিলার জন্য খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা একান্ত আবশ্যক। খাদ্য মজুদ করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন ।

৭. বিনিয়োগ বৃদ্ধি : খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। আর খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়লে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে।

৮. জাতীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার : বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদের দেশ। প্রকৃতি তার অকৃপণ হাতে এদেশকে প্রচুর ধন সম্পদ দিয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে।

৯. পরিত্যক্ত জমির ব্যবহার : আমাদের দেশে অনেক পরিত্যক্ত জমি আছে। এসব জমিকে চাষের উপযোগী করে তুলতে হবে এবং সেগুলোতে পরিকল্পনা করে খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে হবে। এ ব্যাপারে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে।

Read More:  রচনাঃ একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ

১০. সরকারের সহযোগিতা : আমাদের দেশে চলমান খাদ্য সংকট নিরসনে সরকারি সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারকে খাদ্য সংকট থেকে উত্তরণের যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে । ১১. জনসংখ্যার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ : আমাদের দেশে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ খাদ্য সংকটের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। তাই খাদ্য সংকট নিরসনকল্পে জনসংখ্যার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

উপসংহার : দেশের খাদ্য সংকট নিরসনের জন্য সরকার অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। কারণ আমাদের দেশের প্রাণ যে কৃষি, সেখানেই অনেক সমস্যা বিদ্যমান। কৃষি নিয়ে আরও অনেক গবেষণার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি প্রয়োজন উন্নত জাত উদ্ভাবন করা। অল্প জমিতে অধিক ফসল কীভাবে উৎপাদন করা যায় সে নিয়েও গবেষণা করতে হবে।

সম্পূর্ণ পোস্টটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করছি আমাদের এই পোস্ট থেকে রচনা যেটি তুমি চাচ্ছিলে সেটি পেয়ে গিয়েছ। যদি তুমি আমাদেরকে কোন কিছু জানতে চাও বা এই রচনা নিয়ে যদি তোমার কোনো মতামত থাকে, তাহলে সেটি আমাদের কমেন্টে জানাতে পারো। আজকের পোস্টে এই পর্যন্তই, তুমি আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করে আমাদের বাকি পোস্ট গুলো দেখতে পারো।

Fahim Raihan

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *