রচনাঃ পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

আজকের পোস্টে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা শেয়ার করব “বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা“। এই রচনাটি আশা করি তোমাদের পরীক্ষায় কমন আসবে। আমরা এই রচনাটি যত সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করেছি – তোমাদের পড়তে সুবিধা হবে। চলো শুরু করা যাক।

পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

ভূমিকা : বন প্রকৃতি মানুষের নিকটতম প্রতিবেশী। বনভূমিই পৃথিবীর প্রথম আগন্তুক । অরণ্য তার অবারিত শ্যামল ছায়া বিস্তার করে তাকে সূর্যের প্রখর দহনজ্বালা থেকে রক্ষা করেছিল। তার ক্ষুধার্ত মুখে অরণ্যই দিয়েছিল খাদ্য, প্রকৃতির নানা বিরুদ্ধ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য দিয়েছিল নিরাপদ আশ্রয়। গভীর অরণ্যের বুকে মানুষ গড়ে তুলেছে চঞ্চল জনপদ। জীবন স্পন্দনে অপূর্ব কোলাহলমুখর সে জনপদ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বিস্তৃত হয়েছে। মাঠে মাঠে ফসলের দোলা, কর্মের সমারোহ, আনন্দের জয়ধ্বনি জেগেছে। কৃষি সভ্যতার বুনিয়াদ মজবুত হয়েছে। প্রয়োজন বেড়েছে মানুষের। বনের গাছ কেটে মানুষ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরি করেছে, ঘরের খুঁটি দিয়েছে। জীবিতকালে গাছ ফুলের সুবাস দেয়, ফল দেয়, অক্সিজেন দেয়, মরণের পরেও সে নানানভাবে মানুষের উপকার করে যায়। পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়নের মতো এমন উপকারী আর কিছু নেই ।

বনায়নের উদ্দেশ্য : মানুষ আজ অরণ্য বিনাশের মাধ্যমে পৃথিবীতে ডেকে আনছে মরুভূমি। অরণ্যই মরুভূমিকে প্রতিরোধ করতে পারে, অরণ্যই মরুভূমিকে শ্যামল স্নিগ্ধ স্নেহময়ী জননীর মূর্তি দান করতে পারে। বনায়নের মাধ্যমে সম্ভব হয় পরিবেশ সংরক্ষণ ও উদ্দেশ্যই হলো তাই। অরণ্যের তরুশিশুদলকে মানবসমাজের সান্নিধ্যে আহ্বান করাই তার মূল উদ্দেশ্য । জনভূমি ও বনভূমির মধ্যে একদিন ব্যবধান ছিল না। পাশ্চাত্য সভ্যতার নগরকেন্দ্রিকতা অরণ্যকে ধ্বংস করে তার ওপর তাঁর কাঠ পাথরের কৃত্রিম শোভা স্থাপন করে প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির কবরভূমি রচনা করেছে। বনায়নের উদ্দেশ্য এই কবরভূমি থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করে একটা সুন্দর পরিবেশ উপহার দেওয়া । তাই কবি বলেছেন—

“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,”

বনভূমি ও মানবজীবন : মানবজীবন ও অরণ্যজীবন— প্রাণের এই দুই মহান প্রকাশের মধ্যে বাজে একটিমাত্র ছন্দ। ঋতুচক্রের আবর্তনের পথে উভয়ের একই স্পর্শকাতরতা। বসন্তের দক্ষিণ বাতাসে মানুষ তার হৃদয়ের আনন্দানুভূতিকে চিত্রে, সংগীতে কিংবা কবিতায় প্রকাশ করে । আর অরণ্য তার বাসন্তী বেদনাকে প্রকাশ করে অশোক, পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম প্রগলভতায় । উভয়ের আদান প্রদানের সম্পর্কও অতি নিবিড়। এক বিপুল ভ্রান্তিবিলাসের জন্য মানুষ এতদিন তার পরম বন্ধুকে চরম শত্রু মনে করে নির্বোধ ঘাতকের মতো ধ্বংসের পৈশাচিক লীলায় মেতে ওঠেছিল । কাজেই, আজ আর বনভূমি ধ্বংস নয়, বনভূমি সৃজনই প্রয়োজন।

Read More:  রচনাঃ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও এর প্রতিকার

বাংলাদেশের বনভূমি : বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি বনায়নের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন আছে। যেমন : গাজীপুর জেলার অন্তর্গত ভাওয়ালের গজারি বন, টাঙ্গাইলের মধুপুরের বন, খুলনা বিভাগের অন্তর্গত সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমি, কুমিল্লার শালবন বিহার ইত্যাদি। এককালে এসব বনাঞ্চল বড় বড় গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে বনভূমি প্রায় উজাড় হওয়ার পথে । এতে পরিবেশগত দিক থেকে বাংলাদেশ ভীষণ সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশ ও সামাজিক বনায়ন : পরিবেশ নিঃসন্দেহে মানবধাত্রীর মতো। প্রকৃতি ও মানবচরিত্রের মধ্যে বিরোধ নয়, উভয়ের মধ্যে রয়েছে গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক। এই সম্পর্ককে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বিশুদ্ধ পরিবেশ দরকার। তাই পরিবেশ সংরক্ষণের জন্যও বাংলাদেশে বনায়নের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সামাজিকভাবে বনায়ন কর্মসূচি সফল করতে না পারলে মানুষের উপযোগী পরিবেশ সংরক্ষণ করা সম্ভব নয় ।

আমরা জানি, প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য ২৫ শতাংশ বনভূমি আবশ্যক, কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে আছে মাত্র ১৩.৪৬ শতাংশ বনভূমি। আমাদের পরিবেশ ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বনায়ন বৃদ্ধি করা উচিত। তা না হলে আমরা গ্রীন হাউস এফেক্ট-এর করালগ্রাস থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব না। বৈজ্ঞানিকদের সমীক্ষায় জানা গেছে যে, গ্রীনহাউসের প্রভাবে বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেতে পারে, আর তাতে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২২,৮৮৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা পানির নিচে ডুবে যেতে পারে। তাছাড়া আমাদের প্রাণিজগতের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান হলো অক্সিজেন। অক্সিজেন আমরা সাধারণত পেয়ে থাকি গাছপালা বা বনভূমি থেকে। আমাদের দেশের মানুষের জন্য যে পরিমাণ অক্সিজেনের প্রয়োজন, সে পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়ার মতো বনভূমি বাংলাদেশে নেই। তাই মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সংরক্ষণ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাবার জন্য আমাদের বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা খুবই দরকার ।

সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি সফল করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করতে হবে। বনায়নের জন্য যে শুধু বিশাল বনভূমিকেই বেছে নিতে হবে তা নয়, আমাদের বাড়ির আশেপাশে অনেক অনাবাদী জায়গা থাকে, পুকুরপাড়ে পড়ে থাকে অনেক জায়গা, এসব জায়গায় গাছপালা লাগিয়ে বনায়ন কর্মসূচি পালন করা যায়। তাছাড়া রাস্তার ধারে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশেপাশে ও খেলার মাঠের ধারেও গাছ লাগানো যায় । এসমস্ত কর্মসূচি শুরু হলে সামাজিকভাবে মানুষ উৎসাহিত হবে এবং বনায়নে এগিয়ে আসবে ।

Read More:  রচনাঃ বাংলাদেশের গানের পাখি

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফল করার উপায় : বনভূমির কাছ থেকে এতগুলো উপকার পাওয়ার জন্য দরকার ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হলে প্রয়োজন পুরাতন গাছকে নির্বিচারে না কাটা এবং নতুন গাছের চারা লাগানো। নতুন করে গাছ লাগাতে বা রোপণ করতে হলে প্রয়োজন চারার। সকল ধরনের গাছের চারা সংগ্রহ করা খুবই কঠিন কাজ। কারণ, গাছের চারা কোনোটা হয় ফল থেকে, কোনোটা বীজ থেকে, আবার কোনোটা হয় ডাল থেকে কলমের মাধ্যমে । এরূপ চারা সাধারণ মানুষের পক্ষে সংগ্রহ করা কঠিন কাজই বটে। তাই এই সংগ্রহের কাজ করতে হবে সরকারের নিজস্ব বিভাগগুলোকে। সরকার যদি এই চারা সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করে, তা হলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফল করা সম্ভব। তাছাড়া গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে, উৎসাহিত করতে হবে।

বনাঞ্চল কমে যাওয়ার পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য পরিকল্পিত উপায়ে বৃক্ষরোপণ করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। চারা রোপণের নিয়ম-কানুন ও পরিচর্যা সম্পর্কে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে জনগণকে অবহিত করতে হবে। সাম্প্রতিককালে বৃক্ষমেলা আয়োজনের মাধ্যমে গাছের চারা সবার কাছে সহজলভ্য হচ্ছে। প্রত্যেকের বাড়ির পাশের অনাবাদি জায়গায়, পুকুর পাড়ে, রাস্তার পাশে, স্কুলের পতিত জায়গায় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষকসহ সকল স্তরের জনগণের মধ্যে যদি বৃক্ষরোপণের উৎসাহ- উদ্দীপনা ও জাগরণ ঘটানো যায়, তাহলে বৃক্ষরোপণ অভিযান সফল হবে বলে আশা করা যায় ।

বনায়নের উপকারিতা : বনায়নের উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না । বনভূমি সূর্যের প্রখর কিরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রকৃতির শোভাবর্ধন করে । প্রয়োজনীয় কাঠ সরবরাহ করে বনভূমি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার বন সৃষ্টি বা বনায়ন ও বন সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক কর্মচারী নিয়োগ করেছেন। সংরক্ষিত বন এলাকা ছাড়াও দেশের সর্বত্র গাছপালা রোপণ করার জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়ে থাকে ।

Read More:  রচনাঃ বাংলাদেশের পুরাকীর্তি

প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বনভূমির অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গাছপালা বায়ুর অঙ্গার কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস গ্রহণ করে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য তৈরি করে ও বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্যাস বাতাসে ছেড়ে দেয়। এই অক্সিজেন আমাদের জীবনধারণের জন্য একান্ত অপরিহার্য। গাছপালা না থাকলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেত এবং অক্সিজেনের অভাবে প্রাণী মারা যেত। একমাত্র গাছপালা বা বনায়নই আমাদের জীবনধারণের সুস্থ পরিবেশের নিশ্চয়তা দান করে। তাছাড়া গাছপালা শুধু ছায়া ও শোভাই বিস্তার করে না, ফুল, ফল দান করে এবং প্রয়োজনীয় কাঠ সরবরাহ করে আমাদের অনেক উপকার করে থাকে । গাছ আমাদের উপাদেয় খাদ্য ও অর্থকরী ফল সরবরাহ করে থাকে । তাই বনায়নের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম ।

উপসংহার : আজ আর বনভূমি ধ্বংন নয়, বনভূমি সৃজনই প্রয়োজন। স্নিগ্ধ, শীতল ছায়া এবং প্রাণের উৎস অম্লজান থেকে আরম্ভ করে খাদ্য, বাসগৃহ, ঔষধপত্র পর্যন্ত সবই অরণ্যের অবদান। অরণ্য ছাড়া পৃথিবী পরিণত হতো মরুভূমিতে । অরণ্যই প্রাণের অগ্রদূত। বিজ্ঞাননির্ভর যান্ত্রিক সভ্যতার ক্রমবিস্তার এবং অরণ্য সংহারে প্রাকৃতিক আবহাওয়ার যে ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এখন বনায়নই তার একমাত্র প্রতিকার ।

সম্পূর্ণ পোস্টটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করছি আমাদের এই পোস্ট থেকে রচনা যেটি তুমি চাচ্ছিলে সেটি পেয়ে গিয়েছ। যদি তুমি আমাদেরকে কোন কিছু জানতে চাও বা এই রচনা নিয়ে যদি তোমার কোনো মতামত থাকে, তাহলে সেটি আমাদের কমেন্টে জানাতে পারো। আজকের পোস্টে এই পর্যন্তই, তুমি আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করে আমাদের বাকি পোস্ট গুলো দেখতে পারো।

Fahim Raihan

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *